বদ নজর থেকে বেঁচে থাকার টিপস ও কিছু ঘটনা

বদনজর থেকে বেঁচে থাকার কিছু টিপস ও কিছু ঘটনাঃ
বদনজর থেকে বাঁচার উপায় এবং এ সম্পর্কিত ঘটে যাওয়া কিছু সত্য ঘটনা জানবো ইনশাআল্লাহ।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“নিজের প্রয়োজন পূরণ হওয়া পর্যন্ত সেটা গোপন রাখার মাধ্যমে সাহায্য লাভ করো! কেননা, প্রতিটা নিয়ামত লাভকারীর সাথেই হিংসুক থাকে!” (তাবারানী)
এটা নজর এবং হিংসা থেকে বাচার একটা টিপস, নিয়ামত গোপন রাখার মানে হচ্ছে অন্য কারো সামনে অহেতুক নিজের, নিজের সম্পদের প্রশংসা না করা, সন্তানের প্রশংসা না করা, মেয়েরা নিজ স্বামীর প্রশংসা অন্যদের সামনে না করা, ছেলেরা নিজ স্ত্রীর প্রশংসা অন্যদের সামনে না করা, নিজের প্রজেক্টের প্রপার্টি ব্যাবসার গোপন আলোচনা অন্যদের সামনে প্রকাশ না করা, অনেকে অহেতুক অন্যদের সামনে গল্প করেন, অমুক প্রজেক্টে এতো লাভ হলো, অমুক চালানে এতো টাকার বিক্রি হলো।
মোটকথা: অহেতুক অন্যের সামনে নিজের কোনো নিয়ামতের আলোচনা না করাই উত্তম, প্রসঙ্গক্রমে করলেও কথার মাঝে যিকর করা, যেমনঃ 'আলহামদুলিল্লাহ্, এবছর ব্যাবসায় কোনো লস যায়নি।' "আল্লাহর রহমতে আমার ছেলে বেশ ভালো রেজাল্ট করেছে!" "মা-শা-আল্লাহ ভাবি! আপনি তো কাপড়ে অনেক ভালো ফুল তুলতে পারেন!!" ইত্যাদি ইত্যাদি.
শুধু খারাপ মানুষের নজর লাগে এমন কিন্তু না, ভালো মানুষের নজরও লাগতে পারে, বদনজর লাগার আসল কারণ হচ্ছে, আমরা যখন কোনো বস্তুর বা ব্যাক্তির প্রশংসা করি তখন এর মাঝে আল্লাহকে স্মরণ করি না।
মা-শা-আল্লাহ, বারাকাল্লাহ বলি না।
কোন কিছু দেখলে আমরা ওয়াও, ও-মাই-গড, এত্তো কিউট, অসাম! বাপরে! কি দেখাইলো মাইরি! হেব্বি হইছে! এক্কেরে ফাডালাইছে-এসব বলি, অথচ আমাদের উচিত ছিলো মা-শা-আল্লাহ, বারাকাল্লাহ, বলা।
কুরআন শরিফে এক ঘটনায় আল্লাহ্ তায়ালা বলেন: “যখন তুমি তোমার বাগানে প্রবেশ করলে, তখন 'মা-শা-আল্লাহ; লা-কুও্ওয়াতা ইল্লা-বিল্লাহ' (সব আল্লাহর ইচ্ছাতে হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া কারো ক্ষমতা নেই) কেন বললে না?” (সুরা কাহাফ-১৮: আয়াত-৩৯)
এখন অন্য কেউ যদি আপনার কিছুর প্রশংসা করে, তাহলে উনি যিকর না করলে আপনার উচিত হবে যিকর করা।
উদাহরণ স্বরুপঃ কেউ বললো- ভাবি আপনার ছেলেটা তো অনেক কিউট! আপনি বলুন- আলহামদুলিল্লাহ্... মনে মনে বলুন- আল্লাহর কাছে বদনজর থেকে আশ্রয় চাচ্ছি। আপনি অন্যের প্রশংসা করতে গিয়ে কথার মাঝে যিকর করুন। "মাশা-আল্লাহ! আপনার রান্না অনেক সুন্দর।"
আর অধিক পরিমাণে সালামের প্রচলন করুন, ইনশাআল্লাহ হিংসা দূর হয়ে যাবে।
সর্বোপরি আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমরা বদনজর থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাও, কেননা বদনজর সত্য!”
নজর থেকে বাচার একটা দুয়া, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটা পড়ে হাসান এবং হুসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমাকেে ফুঁ দিয়ে দিতেন, মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই একই দু'আ আমাদের জাতির পিতা ইবরাহীম আলাইহিচ্ছালামও ইসমাইল আলাইহিচ্ছালাম এবং ইসহাক আলাইহিচ্ছালাম এর জন্য পড়তেন। দুয়াটি হচ্ছে-
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
উচ্চারণঃ আ'উযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা-ম্মাহ। মিং-কুল্লি শাইত্বনিও ওয়াহা-ম্মাহ। ওয়ামিং-কুল্লি 'আইনিল্লা-ম্মাহ।
অর্থঃ আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমার দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টির অনিষ্ট হতে পানাহ চাচ্ছি।
এই হাদিসটি আছে- বুখারি, তিরমিযী, আবু দাউদ, ইবনে মাযাহ, মুসতাদরাকে হাকেম, তাবারানী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ, মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে বাযযার, মুসান্নাফ, মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাকে।
এই দু'আ সকাল-সন্ধ্যায় কয়েকবার পড়ে বাচ্চাদের ফুঁ দিয়ে দিবেন, নিজের জন্যও পড়বেন, ইনশাআল্লাহ তাবিজ-কবচ টোটকা ইত্যাদির কোনো দরকার হবেনা, আল্লাহ তায়ালাই হিফাজত করবেন।
বদনজর বিষয়ে সাহল ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর ঘটনা; যা মুয়াত্তা মালেক, মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাযাহ এবং নাসাঈ শরিফে আছে!
(১) ঘটনা-১ঃ "সাহল ইবনে হুনাইফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কোথাও গোসলের জন্য জামা খুলেছিলেন, উনি বেশ সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন, বদরী সাহাবী আমির ইবনে রবী'আ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে দেখতে পেয়ে বললেন, এতো সুন্দর মানুষ আমি জীবনে দেখিনি, এমনকি এত সুন্দর কোন যুবতীকেও দেখিনি, আমির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কথাটা বলার পরপরই সাহাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সেখানে বেহুশ হয় পড়ে গেলেন, তাঁর গায়ে জ্বর চলে আসলো, মারাত্মক জ্বরে ছটফট করতে লাগলেন হযরত সাহাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু"।
অন্যান্য সাহাবী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমগণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জানালেন, সংবাদ পেয়ে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবস্থা দেখতে আসলেন, সাহল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে হঠাৎ করে এমনটা হবার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি ঘটনাটা খুলে বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন: "তোমরা কেন তোমাদের ভাইকে নজর দিয়ে হত্যা করছো?”
আমির ইবনে রবী'আকে ডেকে বললেন: “তুমি যখন তাকে দেখলে, তখন আরো বরকতের দু'আ কেন করলেনা? বারাকাল্লাহ কেন বললে না?" (অর্থাৎ দুয়া করলে নজর লাগতো না)।
এরপর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন আমির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে বললেন: অজু কর! আমির রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু অজু করলেন, অতঃ পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর নির্দেশে অযুর পানি সাহল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর গাঁয়ে ঢেলে দিলেন, আল্লাহর রহমতে কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি সুস্থ হয়ে উঠলেন।"
এটা বিশুদ্ধ সনদে নাসাঈ এবং ইবনে মাজাহতে বর্ণিত প্রসিদ্ধ একটি ঘটনা, যা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি, আমরা বুঝতে পারি, ভালো মানুষের নজরও লাগতে পারে, এখানে আমির ইবনে রবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তো বদরি সাহাবি, বদরী সাহাবিদের আগের পরের সব গুনাহ মাফ!! এরকম মানুষের নজর লেগেছে, সেখানে অন্যদের নজর লাগাটা তো মামুলি ব্যাপার।
আরেকটা হাদিস,
(২) ঘটনা-২ঃ উম্মুল মুমিনিন হাফসা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা কোনো সাহাবির বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন, ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ওদের হাল-হাকিকত শোনালেন, বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! ওই সাহাবির সন্তানরা প্রায় সময় অসুস্থ হয়ে থাকে.. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, "আসলে বদনজর তাদের দিকে খুব দ্রুত কাজ করে!"
আসমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা এর ব্যাপারেও এরকম ঘটনা পাওয়া যায়.. (হাদিসগুলো মুসলিম শরিফে আছে)
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দিনিয়া-আখেরাতের সকল বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করুন, আমিন।
রুকইয়াহ সাপোর্ট...